মায়ের কষ্ট

রাত দশটা পনেরো মিনিটের ঘরে, ঘড়ির কাটা হাটছে। বাজারে অন্যান্য দোকান গুলো একে একে বন্ধ করে আজকের মতো ইস্তফা দিতে যাচ্ছে। আমিও ফার্মেসীর শাটার টেনে বন্ধ করতে যাব। এমন সময় একজন পরিচিত কাস্টমার এসে বলল একটু একটু রাখেন। আমার আম্মা অসুস্থ ! আম্মার জন্যে ঔষধ নেবো..রুগিনীর অসুস্থের বর্ণনা শুনে বললাম রুগীকে না দেখে ঔষধ দেওয়া যাবেনা । লোকটি কেমন যেন হতচকিয়ে গেলো। আমি বললাম চলুন প্রয়োজনীয় কিছু ঔষধ সাথে নিয়েছি যা লাগে পরে দেখব । আমিতো এই পথেই বাড়ি ফিরব আপনার আম্মাকে দেখে যাবো। ওনার নাম রহিম, হাতে ফাস্ট এইড ব্যাগটি দিয়ে মটর সাইকেলের পেছনে বসিয়ে পাঁচ-মিনিটে রহিম সাহেবের  বাড়িতে পৌছে গেলাম।

বাড়ির সামনে নান্দনিক ফুল বাগান। রাঙানো আলোয় মনোরম পরিবেশ মুগ্ধ করছে বাহিরে। ডুপলেক্স বাড়ি। একটি রুমে আমাকে বসিয়ে বলল আপনি বসুন আমি আম্মাকে নিয়ে আসছি…! আমি  অপেক্ষা করছি পাঁচ মিনিট পর ফিরে এসে বলল আর একটু অপেক্ষা করুন। এখনই নিয়ে আসছি, আমি বললাম কোথায় আপনার মা আমাকে নিয়ে চলুন। এমনিতে রাত হয়ে গেছে আর যে অবস্থা বলেছেন দেড়ি করছেন কেনো? রহিম সাহেব আমাকে কিছু না বলে-ভিতরে রুমে চলে গেলো। আমার কিছুটা বিরক্তি বোধদয় হলো। শুনতে পাচ্ছি ওনার স্ত্রীর সাথে কথা কাটাকাটি হচ্ছে ।

যদিও একটা কথা বলা ঠিকনা, কিন্তু না বলে পারছিনা। শুনলাম রহিম সাহেবের ছেলে ইটালি থেকে আসছে কিছু দিন হলো। ছেলেকে বিবাহ করাবে। সমস্যা হচ্ছে কিপ্টামি স্বভাব আছে যার জন্যে সবকিছু ঠিকঠাক হওয়ার পর সম্বন্ধ ছুটে যাচ্ছে। এটা এলাকার সবাই জানে অনেক কষ্ট করে রহিম সাহেবের মা বাবা রহিম সাহেবকে বড় করছেন । দূর্ভাগ্য রহিম সাহেব এক মাত্র সন্তান হয়েও বাবাকে সুখের মহলে তুলতে পারেনি। সুখের মুখ দেখার আগেই পরপারে চলে গেলেন। বাবার ভিটেমাটিতেই  মায়ের ঘর ভেঙ্গে ডুপ্লেক্স বাড়ি ওঠালেন। যদিও বাবার সম্পদ বিক্রি করে ছেলেকে প্রবাসে পাঠালেন। কিন্তু এখন রহিম সাহেব কে, ছেলে আর ছেলের মা’র কথায় ওঠবোস করতে হয়।

রহিম সাহেব ভিতরের রুম থেকে ফিরে এসে বলল, চলুন ডাক্তার সাহেব। যদিও আমি ডাক্তার নয়, তবু এলাকার সবার নিকট একজন ডাক্তার। সবাই আমার বাব দাদার দেয়া সুন্দর নামটাকে ডুবিয়ে এই নামেই চিনে। আমি রহিম সাহেবের পিছুপিছু হাটছি এবং একটু পরে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবছি পালাবো না কি? মনে মনে সাহস ফিরিয়ে আনলাম যত কিছু হোক , আমি এই এলাকার সন্তান। সাহস নিয়ে বল্লাম কাকা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন অন্ধকারে । আপনি না আপনার মা কে দেখাবেন। এখন ঘর ছেড়ে বাঁশঝাড়ে অন্ধকারে কেনো? রহিম সাহেব বলল আরে বাবা ভয় পেয়োনা.. চলো আমার সাথে..! চলতে গিয়ে মনে হলো এই পথে কেউ তেমন চলাচল করেনা। একজনের বেশি লোক যাওয়া যায়না। ওনি টচ লাইটের আলোয় আমাকে পথ চলতে সহযোগীতা করছেন । অবশেষে ওনার মাকে পেলাম মায়ের ঘরে ! কিন্ত এই আমি কি দেখছি…মায়ের এই মর্যাদা। এতো বড় বাড়ি এই নির্জনে। এখানে একটা মানুষ থাকতে পারে আমার জানা ছিলনা। ভাগ্যিস বাড়িটি বাউন্ডারি ইটের দেয়াল দেওয়া চারপাশে নয়তো শেয়াল টেনে ছিঁড়ে খেতো। রহিম সাহেবকে মায়ের কষ্ট থেকে বাঁচানো যেতো। ভাঙ্গাচূড়া কয়েকটা বাঁশের খুটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে পুরনো ঝংধরা টিনের ছাদ। নোংরা পরিবেশ বসবাসের অনুপযোগী একটি দু-চালা টিনের ঘর। ঘরে মাকড়সা জালবুনে রেখেছে ধুলো বালির আস্তর জমে আছে। ঘরের ভেড়াগুলো ভেঙ্গে পরে গেছে পাটখড়ির হওয়ায়। উইপোকা বাসা বেঁধেছে মা শুয়ে আছে হয়তো তার বাপকালের চকিতে । এই ঘরখানি এই বাড়ির এক সময় লাকড়ী রাখার ঘর ছিল আজ মায়ের ঘর। আধুনিকতার কোন সুযোগ এখানে নেই বিদ্যুতের যুগে একটি ভাঙ্গা হারিকেন মিটমিটে জ্বলছে ঝাপ্সা আলোয় মায়ের জীবন।

মায়ের শরিরে প্রতিটি হাঁড় জেগে ওঠেছে। কংকালের ভেতর থেকে আমাদের উপস্থিতি পেয়ে লড়েচরে ওঠল। মুখে দাত না থাকায় চোয়াল দুটি ভেঙ্গে গেছে। দেখলাম জ্বরে কাঁপুনি এসে গেছে। চোখ দুটি মিটমিটে বলছে অসহায়ের কথা । ছেলে মেয়ে জন্মদিয়ে মায়ের সোহাগের অসহায়তার কথা। আমি ওনার চিকিৎসার কথা বলার আগে বলতে চেয়েছিলাম মায়ের সম্মানের কথা । তার আগেই চালাক মানুষ বলে ওঠল। ঘরে রঙ করেছি রঙের গন্ধে আম্মার শ্বাসরোগ বেড়ে যাবে ভয়ে এখানে রেখেছি । আমি ভ্রূক্ষেপে বললাম ঠিকই বলেছেন মায়ের এখানেই রাখার যায়গা! এখানে রাখলে শ্বাসরোগ হবেনা । আমি চললাম আপনার মায়ের চিকিৎসা আমাকে দিয়ে হবেনা। এই বলে বের হতে গেলাম, বুঝতে পারলাম কি যেন একটা বাঁধা পেলাম টেনে ধরছে। চেয়ে দেখি রহিম সাহেবের মা আমার জামা টেনে ধরছে। যেন আমি চলে না যায়। আমি থেমে গেলাম অস্বভাবিকভাবে। থার্মোমিটার দিয়ে দেখলাম জ্বর একশো তিন ফারেনহাইট। শ্বাসকষ্ট ও লো- প্রেশার। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পূর্বে ডুপ্লেক্স বাড়িতে মায়ের জায়গা হলো। পর দিন সকালে যাওয়ার পথে নিজ থেকে দেখতে গেলাম কেমন আছে এই মা । বাড়িতে ডুকেই  পেলাম রহিম সাহেবকে ওনি হাসি মুখে মায়ের কাছে নিয়ে গেলো। গতরাত আর আজ সকাল সত্যি পাল্টে গেছে দুনিয়া। যেন আমি ফুটন্ত ফুলের হাসি দেখতে পেলাম মায়ের মুখে। দেখে মনে অনেক শান্তি পেলাম ঐ দিনটি যেন ছিল আমার সেরা দিন। মনে মনে ভাবলাম আহ্ একটু যত্ন পেলে অবহেলিত এইসব মায়েরা কত না ভালো থাকতো।

এভাবে মাস দুয়েক আমি মাঝেমধ্য আসা যাওয়ার সময় সুযোগ পেলে দেখা করে যেতাম। কেমন আছেন খোঁজ খবর নেওয়ার পাশাপাশি একরকম মায়া হয়ে যায়। আমি একটা কাজে ঢাকা আসি এখানে এক সপ্তাহ আমাকে থাকতে হয় । এক সপ্তাহে পর বাড়িতে এসে বাজারে যাওয়ার পথে জানতে পারি রহিম সাহেব এর মা আর নেই।

রহিম সাহেবের মা আবার অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হসপিটালে দুদিন থাকার পর চির বিদায়ের পথে মা চলে গেলেন। এই দিন রাতে রহিম সাহেবের মায়ের সাথে দেখা প্রথম রাতের কথা বারবার মনে হচ্ছে । কি করে সন্তানরা এরকম হয়। যে মা এতো ত্যাগ করে আমাদের জন্য। আর আমরা তাদের বৃদ্ধ বয়সে তাদের ভুলে যায়! তাদের জন্যে যে দুনিয়ার আলো দেখতে পেলাম। আজ কিছু সন্তানরা এরকম… নাহ, ভাবতেই পারছিনা। আমার অস্বস্থি ছটফট দেখে আমার সহধর্মী ব্যপারটা জানতে চাচ্ছে। আমি ঘটনাটি খুলে বললাম। একজন মা এতো কষ্ট করে দশমাস গর্ভে রেখে খেয়ে না খেয়ে সন্তানকে মানুষ করতে চায়। তার সন্তান বড় হোক সুখে থাকোক এই প্রার্থনা করে সবসময়। আর সেই সন্তান যখন সুখের ঘরে প্রবেশ করে সেই ঘরে মায়ের যায়গা হয়না। এমন সন্তান যেনো কোন মায়ের গর্ভে না আসে। পৃথিবীর সকল মা ভালো থাকুক সন্তানের অভাব থেকে দূরে থাকুক। প্রতিটি মানুষের মায়ের মতো সেবা হোক জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেন কোন মা বাবা কষ্ট পেতে না হয় সেই মন মানুষিকতা থাকুক সকল সন্তানের।

সমাপ্ত

2 thoughts on “মায়ের কষ্ট

Add yours

    1. আমাদের চোখের সামনেই ঘটে ভয়াবহতা বুঝতে পারিনা টুকরো টুকরো ঘঠনাগুলো এক না হলে

      Like

Leave a comment

Create a free website or blog at WordPress.com.

Up ↑

Design a site like this with WordPress.com
Get started